দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ হার দেড় মাসে ২০ শতাংশ থেকে কমে ১২ শতাংশে এসেছে। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭২ জন। দেশের ৫০-৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠী রোগপ্রতিরোধী হয়ে উঠলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে বলা যাবে। এ ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনই সর্বোত্তম প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে বলছেন বিশ্লেষকরা। তবে এ বছর ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বেশিসংখ্যক মানুষ যদি আক্রান্ত হয়ে যায়, বিশেষ করে ৬০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ, তাহলে স্বাভাবিকভাবে তাদের মধ্যে ইমিউনিটি ডেভেলপ করবে। বাকি যারা থাকবে তাদেরও অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। ঝুঁকি হলো, এত বেশিসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়বে। কমপক্ষে ৬০ ভাগ মানুষ আক্রান্ত হতে হবে। এটা ইনফেকশন হয়ে বারবার অর্গানিজমের মাধ্যমে হতে পারে। আবার ভ্যাকসিনের মাধ্যমেও হতে পারে। এতে ৮০ ভাগ মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হয়ে যাবে। হার্ড ইমিউনিটিতে ইনফেকশন ঝুঁকি আছে। এখন ১২০০ থেকে ১৫০০ পর্যন্ত আক্রান্ত হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে। যদি ৬০ ভাগ মানুষ আক্রান্ত হয়ে যায়, তাহলে অনেক মারা যাবে। এটাই ঝুঁকি।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যখন একটি এলাকার বেশির ভাগ মানুষকে কোনো একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক দেওয়া হয়, তখন ওই এলাকায় ওই রোগটির ছড়িয়ে পড়ার  আশঙ্কা থাকে না। কারণ ওই এলাকায় আর সংক্রমিত হওয়ার মতো মানুষই থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, একটি সম্প্রদায়ের কারও মধ্যে যদি হাম দেখা দেয়, আর বেশির ভাগ মানুষের যদি টিকা দেওয়া থাকে, তাহলে ওই রোগটি আর কারও মধ্যে ছড়াতে পারে না। এটাই হার্ড ইমিউনিটি বা কমিউনিটি ইমিউনিটি। এর কারণে নবজাতক শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষ যাদের টিকা দেওয়া সম্ভব নয় তারা রোগমুক্ত থাকেন। হার্ড ইমিউনিটি তখনই কাজ করবে, যখন একটি গোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষকে প্রতিষেধক দেওয়া থাকবে। যেমন হামের ক্ষেত্রে প্রতি ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনকেই যদি প্রতিষেধক দেওয়া যায় তাহলে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথন বলেছেন, কভিড-১৯-এর  ক্ষেত্রে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা হার্ড ইমিউনিটি হতে অনেক সময়ের প্রয়োজন।

এ জন্য ৫০  থেকে ৬০ শতাংশ মানুষকে রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে হবে, যাতে রোগের শৃঙ্খল ভেঙে যায় এবং অন্যদের সংক্রমিত করতে না পারে। জানা যায়, ‘ইংরেজি হার্ড শব্দটি এসেছে ভেড়ার পাল থেকে। আর ইমিউনিটি হচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ভেড়ার পালকে সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে টিকা দেওয়া হতো। ১০০টি ভেড়ার মধ্যে যদি ৮০টিকে টিকা দেওয়া হতো তাহলে সংক্রমণ আর ওই ভেড়ার পালে ছড়াত না। যদিও ১০০টির প্রতিটিকে টিকা দেওয়া হয়নি, এর পরও তাদের মধ্যে এক ধরনের সুরক্ষা-বলয় কাজ করত। এটাই হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘নির্দিষ্ট সময় পরে মানুষের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে। আমরা এখন বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখেছি, আক্রান্ত অনেক দেশে ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় অ্যান্টিবডি তৈরির হার ২০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো সংক্রমণের তরঙ্গ চলছে। সেখানকার মানুষের শরীরেও অ্যান্টিবডি তৈরি হবে এবং কিছু সময়ের জন্য মানুষ প্রতিরোধী হয়ে উঠবে বলে আশা করা যাবে। তখন ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে সংক্রমণ রুখে দেবে। বিশিষ্ট অণুজীববিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে আন্দাজ করে কিছু বলা সম্ভব হবে না। দিল্লিতে প্রথমে ২০-২৫ ভাগ ছিল। এখন শোনা যাচ্ছে ৩০-৩৫ ভাগ হয়েছে। এটা তারা থিউরিটিক্যালভাবে করছে। আমি আগে বলেছিলাম, ঢাকার মানুষের মধ্যে গড়ে ৩০ ভাগ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সরকারকে স্টাডি করতে হবে। এখন আক্রান্তের যে হার, তাতে আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে ৩৫ ভাগ মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ইনফেকশন হওয়া ৫ ভাগ মানুষ তা জানতে পারছে। বাকিরা জানতেই পারছে না নিজের মধ্যে কখন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এখনো মনে করি, শীতের আগেই করোনা সংক্রমণের হার অনেকাংশে কমে যাবে। দেশে লকডাউন তেমন কাজ করেনি। তাই এটা সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। এতে ভাইরাসও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে কারণে অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে দেশের সিংহভাগ মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবডি চলে আসবে।’ দেশে সেকেন্ড ওয়েবের আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেকেন্ড ওয়েব আমাদের দেশে চলছে। সংক্রমণের হার এখন আর বাড়ছে না, তবে অবস্থান করছে। নতুন করে ছড়ানোর শঙ্কা কম। আশা করা যায়, ইউরোপের মতো ব্যাপক হারে আর ভাইরাস ছড়াবে না।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি কাজ করাটা কঠিন। হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে হলে ৯০ ভাগের বেশিসংখ্যক মানুষ এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হতে হবে।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এটা এখনো স্বীকৃত কোনো পদ্ধতি নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি হতে হলে, যদি এখানে ১৭ কোটি মানুষ থাকে, তাহলে প্রায় ১৬ কোটি মানুষকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে। ১৬ কোটি মানুষ আক্রান্ত হলে এদের মধ্যে যদি ০.০০১ ভাগ মানুষেরও হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তবে দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তবতায় তাদের সেবা দেওয়া অসম্ভব। আর এ কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে মারাত্মক হারে। তাই আমরা ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় জোর দিচ্ছি। মানুষের অ্যান্টিবডি পর্যবেক্ষণে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি কিট বাজারে ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে মানুষের ইউনিটি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।’ সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে